সাইবার ক্রাইম রোধে আঁচল এর ভিন্নরকম উদ্যোগ

বাংলাদেশের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১৩ ধাপে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। যার ৬৮ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী। (সূত্রঃ আঁচল ফাউন্ডেশন)

0 110

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রিয়া। পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনি করিয়ে সে তার হাতখরচের টাকা পেয়ে যেত। কিন্ত করোনাকালীন সময়ে টিউশনি বন্ধ থাকায় বেশ হতাশায় ভুগছিল। কারণ প্রতি মাসেই তাঁর পরিবারকে কিছু খরচ দেয়া লাগে। হঠাৎ তাঁর মাথায় অনলাইনে ব্যবসা করার আইডিয়া আসলো। তাই সে তার বিজনেসের সব কাজ গুছাতে শুরু করে দিলো। সে খেয়াল করলো অনেকেই বিভিন্ন লাইভের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করছে। তাই সেও লাইভ করা শুরু করলো। প্রথম দিকে ভালো সাঁড়া পেলেও কিছুদিন পর লাইভ চলাকালীন সময়ে নানা ধরণের বাজে মন্তব্য আসা শুরু হয়। শুধু তাই নয় তার লাইভের স্ক্রিনশট নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। আর যার ফলে প্রিয়া মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরে এবং এক পর্যায়ে সে ব্যবসাই বন্ধ করে দেয়।

বিশ্বায়নের এই যুগে ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে ফেইসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদিসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষেরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি অজানা। ফলে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্যদের ক্ষতি করার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছি আমরা অনেকেই।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যেভাবে এর নিয়মিত ভিকটিম হচ্ছে, তেমনি তারা নিজেরাও অজ্ঞতাবশত অন্যকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। অনেক সময় তাদের এই শেয়ার, কমেন্ট এবং লাইক গুজব তৈরির পিছনে ভূমিকা রাখছে। কিংবা তরুণ সমাজ বিশেষ করে মেয়েদের প্রতিনিয়ত নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা আগামি দিনের ভবিষ্যত। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইমের ফলে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে ভয়াবহ ধরনের ভয়ের ভিতর রয়েছে তারা।
এ সকল বিষয় চিন্তা করেই ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ হাতে নেয় আওয়াজ প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টির মূল উদ্দেশ্য হলো তরুণদের মাঝে সাইবার সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দানের মাধ্যমে সহায়তা করা । একই সাথে যদি কেউ ভিকটিম হয় তাকে আইনি সহায়তা পাওয়ায় সহযোগিতা করা।

আওয়াজ প্রজেক্টের উদ্যোগে আগামী ৯ এপ্রিল, শুক্রবার রাত ৮:৩০ ঘটিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে “সোশ্যাল মিডিয়া; হোয়াট উই লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ?” শীর্ষক শিরোনামে একটি ওয়েবিনার। উক্ত প্রোগ্রামে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তাহসিন এন রাকিব, যিনি তাহসিন্যাশন নামে অধিক পরিচিত। ইন্টারনেট বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে আমরা কোন ধরনের কন্টেন্টের সাথে নিজদের সংযুক্তি রাখবো আর কোন কন্টেন্টকে উপেক্ষা করবো সেই বিষয়ে আলোকপাত করবেন।

তিনি আরো কথা বলবেন “সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের কি শেয়ার করা উচিত বা উচিত নয়, একটা ভুল শেয়ারের কারণে একজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন তা নিয়েও।” সেইসাথে ওয়েবিনারটিতে অংশগ্রহণকারীদের কোনো সমস্যা থাকলে তার যথাসম্ভব সমাধান দেয়া হবে।

”আওয়াজ” প্রজেক্ট সম্পর্কে “আঁচল ফাউন্ডেশনের” প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তানসেন রোজ বলেন “আমরা তরুণরা যদি এগিয়ে এসে সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তুলতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি তবেই এই অপরাধের হার কমার সম্ভাবনা আছে।
ডিজিটাল যুগে সাইবার ক্রাইম তরুণদের জন্যে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষার অভিপ্রায়েই আঁচল ফাউন্ডেশন প্রজেক্ট আওয়াজের মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারীদের জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। আশা করি এ ওয়েবিনারে সবাই যুক্ত হলে সাইবার ক্রাইম সম্পর্কিত অনেক অজানা তথ্য আপনাদের জানা হবে।”

উক্ত ওয়েবিনার নিয়ে ফাউন্ডেশনটির আওয়াজ প্রজেক্ট সমন্বয়কারী ও সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক জুয়েল এইস বলেছেন, ডিজিটাল বিশ্বায়নের এই যুগে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার যতটা বেড়েছে আমরা ততটা সচেতন হতে পারিনি আজও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ইন্টারনেটে আমরা কোন কিছু শেয়ার করার আগে সেটির প্রভাব সম্পর্কে একবারও চিন্তা করিনা। ভিত্তিহীন খবর কিংবা মিথ্যা তথ্য সম্বলিত আপডেটস আমরা হরহামেশাই শেয়ার করে ফেলি, যা পরবর্তীতে নিজেদের জন্য যেমন বিপদজনক হয় ঠিক তেমনি সমাজেও একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে প্রচুর পরিমাণ জানতে হবে, সচেতন হতে হবে, সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সর্বপরি, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে হবে।

এই সম্পর্কে ফাউন্ডেশনের আওয়াজ প্রজেক্টের লিডার জিনাতুল জাহরা ঐশী বলেন ”সাইবার ক্রাইমের শিকার ব্যাক্তিটিই জানেন তার এবং তার পরিবারের উপর দিয়ে কি ঝড় যায়। তারা যেনো অপরাধ না করেও দোষী সাব্যস্ত হয়! আমরা আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট আওয়াজ এর মাধ্যমে সেই সকল ভিক্টিমদের পাশে দাঁড়াতে চাচ্ছি যেনো অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনা যায়। সেই সাথে সকলের মাঝে এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছি যে সাইবার ক্রাইমের শিকার হলে চুপ না থেকে আওয়াজ তুলুন দেশ, সমাজ, জাতি ও আমরা আপনাদের পাশে আছি। পাশে আছে আমাদের কর্মঠ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।”

আঁচল ফাউন্ডেশন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা মূলত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে। মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি আমাদের সমাজে এখনও অবহেলিত হওয়ায় অনেকেই এ সংক্রান্ত সমস্যায় উপনীত হলেও নিশ্চুপ থাকে। আর এর ফলে এক সময় তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যার প্রভাব তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি কর্ম ও পারিবারিক জীবনেও দৃশ্যমান হয়। আঁচল ফাউন্ডেশন এই সকল বিষয় মাথায় রেখে যাত্রা শুরু করে সকলকে একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে। সাইবার ক্রাইম মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করার অন্যতম নিয়ামক। তাই এই বিষয়ে আরো বেশি আলোচনা ও সচেতন হওয়া জরুরী। সেই লক্ষ্যপানে অগ্রসর হওয়ার আরেকটি ধাপ এই ওয়েবিনারটি।

আাওয়াজের মাধ্যমে ইতোমধ্যে গত ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সালে আরো একটি ওয়েবিনার সফলভাবে আয়োজন করা হয়েছিলো। উল্লেখ্য, আঁচল ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গত ২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি মেন্টাল হেলথ এবং ক্যারিয়ার সংক্রান্ত বিষয়ে নানাবিধ কার্যক্রম করে আসছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.